।।রামলালার মন্দিরপ্রতিষ্ঠা: একটি দর্শন প্রতিক্রিয়া/অর্ক পুরোহিত।।

অতএব ২০২৪ সালের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে প্রতিটি ভোট রামের নামে হবে। বেশি সময় হাতে নেই, তাই প্রাণ প্রতিষ্ঠার অনতিপরেই শ্রীভগবান বুঝি সোজা দাঁড়িপাল্লায় চড়ে বসতে বাধ্য হবেন। কেননা রামলালার দরবারে সব কাজ চুকিয়ে প্রধানসেবক নমো এতক্ষণে বিকেলের জনসভার বক্তব্য গুছিয়ে নিচ্ছেন। অযোধ্যার ময়দানে সেই সভা দিয়েই শুরু হবে ভাজপার নির্বাচনী অভিযান। সে নির্বাচন উপলক্ষ্যে সমস্ত ফ্লাডগেট খুলে যাবে, লপ্তে লপ্তে টাকা উড়বে আর উড়ন্ত টাকার সেই ঘূর্ণির মধ্যে দাঁড়িপাল্লায় শ্রীভগবান নিথর, নিস্পন্দ হয়ে বসে থাকবেন। ভাজপা মনোভাবাপন্নেরা হয়তো এর মধ্যে অপরাধ কিছু নাও দেখতে পারেন। বিশেষ করে পুরীর শঙ্করাচার্যের তির্যক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর যেখানে কিছুদিন আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে নতুন ভারতে ধর্মকে কোনভাবেই রাজনীতি থেকে পৃথক করা যাবেনা, তখন এব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকা সম্ভব। সুতরাং ধর্মকে এখন মূলত রাজনীতির হাত ধরেই আপন মহিমা স্থাপন ও প্রচার করতে হবে। রামলালার যে এ কেমন কর্তৃত্বমুক্ত অভিষেক, হিন্দুত্বের প্রবক্তারাই সম্ভবত তার যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে পারবেন!

হয়তো তারা বলবেন এসবকিছু শ্রীরামচন্দ্রের ইচ্ছানুসারেই ঘটে চলেছে। হয়তো ইতিমধ্যে তারা একথা বলার জন্য প্রস্তুত। হয়তো শ্রীরামচন্দ্রের ইচ্ছানুসারে অদূর ভবিষ্যতে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা এবং আরও নানাবিধ গণতান্ত্রিক অভ্যাস চর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য লোপ পাবে। যেমনটা বারবার হয়ে এসেছে, ধর্মকে সাক্ষী রেখেই অধর্ম তার অযুত ফণা বিস্তার করেছে। সময়ের সেই সমস্ত কুশীলবেরা, যাদের প্রতি আমাদের  আস্থা ও প্রত্যাশা অগাধ, তারাও এমনতর পরিস্থিতিতে মুখ ফিরিয়ে থেকেছেন, জানিয়েছেন ধর্মের গতি সূক্ষ্ম। কতখানি সূক্ষ্ম তা নিশ্চিত করতে বছরের পর বছর ধরে আমাদের পূর্বসূরিরা পরম যত্ন ও মমতায় মহাকাব্যের কাহিনী নির্মাণ করেছেন। যদিও ধর্ম-অধর্মের প্রাথমিক ধারণা আমরা সেই টেক্সট বা তার বহুপাঠ থেকে লাভ করিনি। বরং জীবনযাত্রার প্রতিটি পরত উন্মোচনের‌ সাথে তাল রেখে আমরা আচরণীয়-অনাচরণীয়ের ফারাক বুঝে নিয়েছি। তাই সমাজ বা দেশভেদে মহাকাব্যের‌‌ পাঠ বদলে গিয়েছে। তবে সে প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সময়ের উল্টোপিঠে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আমাদের সামনে বরং এক অন্য কাহিনীর মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কেউ বলছেন অযোধ্যায় রামলালার মন্দির প্রতিষ্ঠা এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। সেক্ষেত্রে শ্রীভগবানের পুনরাভিষেকের সাথে সাযুজ্য রেখে চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে ভাজপার সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ এবং প্রধানমন্ত্রী পদে নমোর পুনরায় শপথগ্রহণ বিশেষ এজেন্ডা হিসেবে জনমানসে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে। কর্পোরেট আনুকূল্যে এভাবে অবতার পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন নমো। মন্দির উদ্বোধনের প্রাকলগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা গতকাল মুকেশ আম্বানির রাজকীয় বহুতলে বিশেষ আলোর রোশনাই প্রত্যক্ষ করেছি। আজ সকাল থেকে দেখেছি বলিউডের প্রথম সারির অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালকেরা কেমন মুগ্ধ আতিশয্যে মন্দিরপ্রাঙ্গনে উপস্থিত হচ্ছেন। রাজকীয় অভ্যর্থনায় মন্দিরে হাজির হয়েছেন সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। তার হাত থেকে ফুল গড়িয়ে পড়ছে রামলালার শ্রীচরণে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে। মোদির হাতে সময় অল্প, নিশ্চিতভাবেই আগামীতে তার পরিবর্তে উঠে আসবে ভিন্ন মুখ, ভিন্ন কোনও অবতার পুরুষ। সেজন্য আরও অনেক মন্দির ইমারত নির্মাণের প্রয়োজন পড়বে। প্রয়োজন হলে বাবরির অনুকরণে‌ গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে আরও একাধিক মসজিদ স্থাপত্য। ধর্ম-অধর্মের আশ্চর্য গা ছমছমে ন্যারেটিভ স্থায়ী হবে। আখলাক, দানা মাঝি, আফরাজুল শেখেরা সেই ন্যারেটিভের নীচে কাটা পড়বেন। জমানা যখন নিঃসাড়ে পাশ ফিরবে তখন আমরা দেখব, গায়ে রক্তের দাগ মেখে আমাদের ঈশ্বর উপাসনা কতখানি ঘাতকের মুঠোবন্দি হয়ে আছে। 





ছবি: নবভারত টাইমস/ইন্ডিয়া টুডে থেকে প্রাপ্ত

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কোন্ পথে অভয়ার বিচার? - অর্ক পুরোহিতের প্রতিবেদন

।।মহাপৃথিবীঃ মধ্যবিত্তের শয়নকক্ষে বার্লিন দেওয়াল ভেঙে পড়ার আখ্যান।। সায়ন্তন দত্ত

।।ঈশ্বর,লিবিডো ও অতিমারির একটি দিন।। ঊর্ণনাভ চট্টোপাধ্যায়