।।ঈশ্বর,লিবিডো ও অতিমারির একটি দিন।। ঊর্ণনাভ চট্টোপাধ্যায়

নিরাপত্তার সীমাহীন বেষ্টনীর মধ্যে শুয়ে ঈশ্বর লিবিডোর স্বপ্ন দেখছেন।নীচে সারা বিশ্ব অপলকে মুহূর্ত গুনছে।বিশ্বাসী মূলত সময়োচিত নির্বাণে আস্থা রাখেন।খোলস ছেড়ে দিয়ে নির্বিরোধ দিগন্তে ভেসে যাওয়া।সেখানে নিভৃতি বরফের মতো সাদা,ক্রমাগত উঁচু থেকে আরো উচ্চতায় বিলিয়ে দেওয়ার মহামন্ত্র।ঈশ্বর সে মন্ত্রোচ্চারণ শুনতে পাচ্ছেন।মিউজ়িক সিস্টেমে 'বেবিডল ম্যয় সোনে দি' বাজছিল।নীচে,সম্ভ্রান্ত উচ্চতা থেকে যতটা নীচে নামলে মানুষ সামান্য স্পর্শ পেলে বর্তে যায়,সেখানে ঈশ্বরের সাধের আসনটুকু পাতা।ঈশ্বর আর কি চান?ঈশ্বর নিজেকেই প্রশ্ন করেন।ঈশ্বর মনঃসমীক্ষণের আওতায় নিজেকে দেখতে পান।সেই অনাদিকাল থেকে তাঁর সর্বপ্রকার মৌনতা অব্যক্ত যন্ত্রণার মতো ফেটে পড়তে ‌চায়।চেয়েছে।অনুভবের এমন আস্বাদ নতুন নয়।অথচ ঈশ্বর মনোলোকের প্রহরা পেরিয়ে কোন নির্জ্ঞানেই পৌঁছতে পারেননি।এটুকু তাঁর অক্ষমতা।হাজার কোটি বছরের আয়ুষ্কাল সত্ত্বেও তাঁর পেশীতে শৈথিল্য আসেনি,বাৎসল্যে আসেনি ক্ষয়।অথচ তাঁর সুখ নেই।দুঃখও হয়নি কোনদিন।তবু আজ ঈশ্বর লিবিডোর স্বপ্ন দেখছেন।বটচ্ছায়ায় সন্ধের অন্ধকার গাঢ়,ঈশ্বরের চোখে ঘুম নেই,ঈশ্বর জলে ডিঙি ভাসিয়ে দেননি উদ্দেশ্যহীন।তাঁর অতৃপ্তি প্রকান্ড এক দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে তাকে খেয়ে ফেলতে চায়।কাল তাঁর অন্তরের প্রত্যেক মুমূর্ষু দরজা-জানালায় ধাক্কা মেরে চলে অনবরত।তিনি নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে অনুভব করেন তিনি কখনো নিঃশ্বাস নিতে চাননি,প্রয়োজনই পড়েনি।এমনই এক অসহ একাকীত্বে তিনি নির্বাসিত।সেই স্বর্গরাজ্যে,পরিচ্ছন্ন জ্যোৎস্নায় ঈশ্বরের স্বপ্নে পৃথিবীর প্রথম এবং নিবিড়তম মিলনাকাঙ্ক্ষাটি চরিতার্থতা লাভ করে।ঈশ্বর একমুহূর্ত অসফলতার জ্বালা অনুভব করলেও,উদ্যত ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াসী হন।আর যাই হোক,যৌবনের সেই প্রাচীন ভুলটি তিনি আরেকটিবারের জন্যে ঘটতে দিতে পারেন না।এই প্রৌঢ় জীবন তাঁকে নৈর্ব্যক্তিক হতে শিখিয়েছে।যদিও তিনি নেহাতই ব্যক্তিবিশেষের মতো সাধারণ ও তুচ্ছ নন।অস্তিত্বের কোন শর্ত তাঁকে ছুঁতে পর্যন্ত পারেনা।তিনি অজর,অভ্রান্ত এবং অসম্ভব।আকার-নিরাকারের তর্কে তাঁর কোন অভিরুচি নেই।তবু মানুষের উন্মার্গগামিতা তাঁকে ব্যথিত করে।তিনি হতাশ হন।হতাশ হয়ে পারিজাতপুষ্পের আঘ্রাণ গ্রহণ করেন।শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়মিত প্রকৌশল ব্যতীতও তিনি অসামান্যের আঘ্রাণ পেতে পারেন।তখন কিন্তু সমস্ত রেডিও স্টেশন ডেড।নীচে,গ্রহরাজ মন্দিরের পাশে পাড়ার লাফাঙ্গা ছেলেগুলোও কোন বাওয়াল দিচ্ছেনা।জনৈক পুরসভার কাউন্সিলর গত হয়েছেন তিন বছর আগে।যমলোক থেকে তাঁর হাহাকার ভেসে আসছে।পরিতৃপ্তি নেই।এ আকাশগঙ্গায় লিবিডোর কোন সার্থকতা নেই।ঈশ্বর স্পষ্টতই অনুভব করেন এবং সীমাহীন নিরাপত্তার বলয়ে আবিষ্কার করেন তাঁর পরম সুহৃদ দুজনকে।ব্রহ্মান্ডের সেই আদিতম প্রণয়ীযুগল যারা তাদের নির্বাসনকাল কাটিয়ে আবার ফিরে এসেছেন,মিলনের গূঢ় আকাঙ্ক্ষায় যারা বিহ্বলশরীর,তাদের দেখে অচিরাৎ ঈশ্বরের বড় মায়া হল।দিনের পর দিন পরস্পরকে কামনা করে পরিপূর্ণরূপে পাওয়ার এমন দৃষ্টান্ত জগতে বিরল।তাই,সর্বপ্রকার খেদোক্তি ঈশ্বরের কাছে অর্থহীন মনে হলেও আজ তাঁর সত্যিই বড় আফশোস হয়।এই যুগলকে পুনরায় নির্বাসনে পাঠাতে তাঁর সাধ হয়না।তিনি জানেন তারা সফলকাম,তিনি জানেন ঈশ্বরের ঈর্ষায় তাদের বিন্দুমাত্র যায়-আসেনা।


সুতরাং ঈশ্বর চোখ বন্ধ করলেন।নিরলস নিদ্রার ভিতরে কল্পনার কালো নদী বয়ে যাচ্ছে দুর্বার।কোন ছেদ নেই।সময় অশরীরী,অথচ মৃত্যুর মতো ধ্রুব তার পদক্ষেপ।অনিন্দ্য তার সৌন্দর্যবোধ।ত্রিলোকের সকল বিস্ময়ই তার মুগ্ধ দৃষ্টিপাত।

গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন  ঈশ্বরের স্বপ্নালোক এখন ভেসে যাচ্ছে উৎসর্গের আড়ম্বরে।ঈশ্বর খুশি।আর কি চান তিনি?এতক্ষণে নিজের এই প্রশ্নের উত্তর তিনি অবগত হয়েছেন।যা জাগরণে কখনো ধরা দেয়নি,তেমনই এক অস্বাভাবিক তৃপ্তি ঈশ্বর যেন হাত বাড়ালেই স্পর্শ করতে পারেন।এতটা নিকটে,অথচ কি অসহায়ের মতো তাঁকে অস্থির হতে হয়,প্রলয়ের অন্ধকার নিম্নের সামান্য বস্তুজগতকে বিড়ম্বিত করে।ঘুমের মধ্যেই ঈশ্বরে তর্জনী একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে অনিশ্চল হয়ে থাকে।সম্ভবত কয়েক আলোকবর্ষ দূরেই,ব্রহ্মান্ডের কোন ক্ষুদ্র কোণে একটি সদ্যপ্রসূত শৃগালশাবক ওয়াঁআআআ ক্রন্দনে তার অস্তিত্বের প্রথম প্রতিবাদটি লিপিবদ্ধ করে।ততক্ষণে ঈশ্বর পাশ ফিরে শুয়েছেন।

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কোন্ পথে অভয়ার বিচার? - অর্ক পুরোহিতের প্রতিবেদন

।।মহাপৃথিবীঃ মধ্যবিত্তের শয়নকক্ষে বার্লিন দেওয়াল ভেঙে পড়ার আখ্যান।। সায়ন্তন দত্ত