কোন্ পথে অভয়ার বিচার? - অর্ক পুরোহিতের প্রতিবেদন


রাজনীতিকে যদি স্টান্টনির্ভর গতিবিধিমাত্র হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তবে মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  তাঁর সমালোচক-নিন্দুকদের প্রতি মুহূর্তেই দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলতে পারেন। যে বিষয়ে ন্যায়ের দাবী সম্পূর্ণ অসংশয়ে উত্থাপন করা‌ যায়, সেখানেও মাননীয়া‌র চমকপ্রদ অবস্থান প্রতিবাদীদের মধ্যে মতপার্থক্যের সূক্ষ্ম দেয়াল গড়ে তুলতে পারে, বা তাদের আশু লক্ষ্যকে গুলিয়ে দিতে পারে সহজেই। এই সংক্রান্ত অভূতপূর্ব দক্ষতা মাননীয়াকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার আস্বাদ ও দীর্ঘ বাম-শাসিত এক রাজ্যের সফল মুখ্যমন্ত্রীত্বে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। সংসদীয় বামপন্থার ভগ্নশেষের ওপর তিনি তাঁর দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বনিয়াদ গড়ে তুলেছেন,  গণরাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন ব্যক্তিগত ক্যারিশমায়, ম্যাজিকে!

 

কিন্তু শুধুই কী ব্যক্তি? আন্দোলনকারীদের লড়াই কী এই ব্যক্তি মমতার বিরুদ্ধে? মাননীয়া নিজে এ প্রশ্নের উত্তর বিলক্ষণ জানেন বলেই হয়তো কখনও  বাংলাদেশের অভ্যুত্থান তাঁর ভাষ্যে স্থান করে নেয়, আবার কখনও উঠে আসে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে আন্দোলন-অনশনের প্রসঙ্গ। আসলে তিনি জানেন নবীন চিকিৎসকদের লড়াই শুধুমাত্র একজন ব্যর্থ প্রশাসক বা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নয়। তাই সরকারি হাসপাতালে কর্মরত এক চিকিৎসকের নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার দায় নিতে অস্বীকৃত হলেও, অবলীলায় তিনি আন্দোলনরত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের পাহারাদার বনে যেতে পারেন! তা-ও আবার সেই বিশেষ পরিস্থিতিতে, যখন গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার চলাকালীন তিনি নবীন চিকিৎসকদের মুখোমুখি হতে অপ্রস্তুত! কী অদ্ভুত, অনন্যোপায় দ্বৈততা! সম্মিলিত প্রতিবাদ-আন্দোলনের প্রথম ধাপে আক্রমনাত্মক হলেও, পরবর্তীতে জনমানুষের নাছোড় মনোভাবের বিরুদ্ধে পিছু হটতে গিয়ে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী এই দ্বৈত রাজনীতির খোলসে ঢুকে পড়তে পারেন কী সহজেই! ফলত কেউ ধরে নেন, এই বুঝি পাশার অক্ষ উল্টে দিলেন মাননীয়া, কেউ ধরে নেন তুমুল ব্যর্থ হয়ে পিছু হটলেন। কিন্তু পিছু হটতে হটতেও কী ভিন্নস্বরের প্রতি কিছুটা নমনীয়, সহানুভূতিশীল হলেন তিনি? নাকি ক্যামেরার সবটুকু আলো কাড়লেন, প্রচারযন্ত্রের সামনে ছুঁড়ে দিলেন নিজের সদর্প ঘোষণা এবং সুনিপুণ কায়দায় তাঁর চিরপরিচিত অথচ চিরনতুন দ্বিমুখী রাজনীতির কৌশল প্রয়োগ করলেন আরো একবার? ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন রয়েছে মনে রাখার যে, পুলিশের পূর্ণ সহযোগিতায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও তাদের নিয়ন্ত্রক সরকারি মাথাদের প্রত্যক্ষ মদতে অভয়ার ধর্ষণ ও হত্যার সমস্ত প্রমাণ প্রকাশ্যেই মুছে ফেলা হচ্ছিল। উপরন্তু গভীর রাতে ন্যায়বিচারকামী আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে এসেছিল দুষ্কৃতি হামলার খড়্গ। সবটা ঘটেছিল‌ প্রশাসন ও গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে, একেবারে প্রকাশ্যেই। আজ আমাদের রাজ্যের মুখ্য প্রশাসক মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী এবিষয়ে তাঁর ভাবনা বা মতামত জানিয়েছেন? আমার জানা নেই।

 

হয়তো এব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী শীঘ্রই বলবেন। হয়তো তিনি জানাবেন রাজ্যের স্বাস্থ্যবিভাগের শিখরছোঁয়া দুর্নীতির মতো এসব ঘটনাও তাঁর অগোচর! রাজ্যে প্রশাসনিক যাবতীয় দুর্নীতি ও অপকর্মের উর্ধ্বে তাঁর অবস্থানের কথা হয়তো শেষাবধি প্রণয়নের চেষ্টা করা হবে। বারবার বলা হবে 'সত্যি কেউ দোষ করে থাকলে' তার বিচার হবে! এতকিছুর পরেও সত্যি করে কেউ দোষ করেছে সে খবর জানার অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের, অথবা সঞ্জয় রাই বা সন্দীপ ঘোষের ওপর চলা তদন্তের ওপর আস্থা রেখে শুধুমাত্র অপেক্ষা করে যেতে হবে বিচার পাওয়ার। বিচার অর্থে কী ফাঁসি? নাকি মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ? নাকি নবীন চিকিৎসকদের পাঁচ দফা? মাননীয়া এর মধ্যে ঠিক কোন্ ধরনের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন তা শোনার আগ্রহ রইল। বাকি‌ সবকিছু হয়তো জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ও কার্যবিধির উপরেই নির্ভর করছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

।।মহাপৃথিবীঃ মধ্যবিত্তের শয়নকক্ষে বার্লিন দেওয়াল ভেঙে পড়ার আখ্যান।। সায়ন্তন দত্ত

।।ঈশ্বর,লিবিডো ও অতিমারির একটি দিন।। ঊর্ণনাভ চট্টোপাধ্যায়