।।প্রসঙ্গ ক্ষুদিরাম।। শুভদীপ ভট্টাচার্য্য

 ' ওরা আকাশে জাগাত ঝড়'।সেই উত্তাল ঝড়-ঝঞ্ঝার কোনো এক 'আঁধি' ক্ষুদিরাম।ক্ষুদের বিনিময়ে কেনা,তাই নাম ক্ষুদি।মা নেই, দিদিই মা, মানুষ করলেন বুকে করে।তারপর সারাদেশের একজন হয়ে জাতির দুঃখ ঘোঁচাতে দামাল ছেলের একদিন সহসা বিপ্লবী হয়ে ওঠা।দেশের সীমানা জুড়ে নবজাতিত্ব গড়ে ওঠার অঙ্কুরেই সে চেতনার সংহতি আরো দৃঢ় হয়ে ওঠে যে নামে, সে নাম 'শহীদ ক্ষুদিরাম'।


কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড।১৯০৭ সালে তারই আদেশে কারাদন্ডে দন্ডিত হন বিপিনচন্দ্র পাল।সুশীল সেনের উপর তারই নির্দেশে চলে জনসমক্ষে নির্মম বেত্রাঘাত।যুগান্তর, বন্দেমাতরম পত্রিকার সম্পাদকদের কপালে অশেষ লাঞ্ছনার নিয়তি এঁকে দেন কিংসফোর্ড। নিজের দেশকে ভালোবাসার পদ্ধতি ও কানুন শিখিয়েছিলেন শাসকোচিত উপায়েই। তবু ছকভাঙা জীবনের কাহিনীই একদিন হয়ে যায় ইতিহাস।সাম্রাজ্যবাদী অত্যাচারের চরম প্রতিভূ এই কিংসফোর্ডকে শেষমেশ বিচারালয়ে হাজির করল বিপ্লবী আদালত।গোপন বিচারে রায় হল মৃত্যুদন্ডের।কথিত যে সেই এজলাসের বিচারপতি, রায়দাতা ছিলেন শ্রীঅরবিন্দ, চারু দত্ত ও সুবোধ মল্লিক। 

বইয়ের মধ্যে বোমা পাঠিয়ে শাস্তিদানের প্রথম প্রচেষ্টা ভেস্তে গেলে শপথের ভাস্বরে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হতে এগিয়ে আসে ক্ষুদিরাম।শুধু ক্ষুদিরাম নয়, একইসঙ্গে প্রফুল্ল চাকি।কিংসফোর্ডের মজঃফরপুরে বদলি হলে অকুতোভয় দুই তরুণ পাড়ি জমায় মজঃফরপুর।সাতদিন কেটে যায় স্রেফ রাস্তা বা ধর্মশালায়।বুকে বাড়তে থাকে স্পন্দন, পাল্লা দিয়ে উদ্বিগ্নতা।অপারেশনের সমস্ত ক্যালকুলেশন ঠিক ঠিক ভাবে মেলাতে তৈরি হল জবরদস্ত প্ল্যান।

৩০শে এপ্রিল। রাত সাড়ে আটটা। ক্লাবগৃহে চলছে আয়েশের উৎসব, বিনোদনের উপায় তাস খেলা। খেলা শেষ করে কিংসফোর্ড দম্পতি ও কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা উঠে পড়ে গাড়িতে।গাড়ির চাকা কিছু এগোতেই তামাম এলাকা সচকিত হয় প্রচন্ড শব্দে। কেঁপে ওঠে দিগন্ত।গাড়ি শতধা বিচূর্ণ। বিপ্লবী অকুতোভয়ের নির্মল হাসি। অপরাধীর শাস্তির পর যতখানি নির্মল হাসে দেশ।কিন্তু পরক্ষণে জানা যায় নিশানা ছিল ভুল।নিরাপরাধের মৃত্যুতে ক্ষুদিরাম, প্রফুল্লের মুখ হয়ে যায় ম্লান, বুকের ওপর যেন পাথর জমা। পুলিশের তাড়া খেয়ে অবশেষে নিজেই নিজেকে গুলির আঘাতে বিদ্ধ করে স্বদেশের মুখকে উজ্জ্বল করে শহীদ হন প্রফুল্ল।ক্ষুদিরাম তখনও ছুটছেন। পথে ফেলে এসেছেন চটিজুতোজোড়া।স্টেশনের অনতিদূরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে তাকে। তৎক্ষনাৎ হাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি আর হতবাক জনতার ব্যাকুল দৃষ্টি। বাংলার মায়েরা দেখে নিচ্ছেন এক কিশোরকে, যার স্বপ্ন টলটলে চোখ নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে স্বাধীনতার। মনে মনে সেমূহুর্তে সংকল্পবদ্ধ হাজারো ক্ষুদিরামের মা। পৃথিবীর নির্মল আকাশ সেই হয়ত শেষবার দেখে উদাত্তকন্ঠের আওয়াজ 'বন্দেমাতরম'। 


এরপর বিচার। বিচারে মৃত্যুদন্ডাদেশ।ফাঁসির দড়িতে মোম কেনা লাগানো হয় সেই প্রশ্নের দ্বারা গোটা শাসন ব্যবস্থাটাকে তীব্র বিদ্রুপের মুখে দাঁড় করিয়ে গোটা ভারতের বুকে প্রান্ত প্রত্যন্তে লাখো শহীদের মূর্ত স্বপ্নের মতো অমর হয়ে গেলেন ক্ষুদিরাম।লেখা হলো ইতিহাস।কেউ গলায় তুলে দিল বরমাল্য, কেউ নেহাৎই বৈঁচি ফুলের মালা, কেউ কেউ 'সন্ত্রাসবাদী' আখ্যা দিতেও কার্পণ্য বোধ করলেন না।

বিবেককে আবিলতা-পঙ্কিলতায় ডুবিয়ে দিতে চেয়েছে সব যুগের শাসক-নিপীড়ক। একুশ শতকেও সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে।আঁজলা আঁজলা বুকের রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে আনা স্বাধীনতা বিকিয়েছে শাসকের নির্মম আপোষে।প্রতিরাতে গুপ্তঘাতকের মতো শাসক হানাদারের নির্মম লুঠ চলেছে মনন-সংস্কৃতি-নৈতিকতার রাজ্য জুড়ে। যৌবন বিপথগামী হলেই আটকে থাকে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। থমকে থাকে বিপ্লব।তাই সংস্কৃতি-চিন্তা-মননের দেশে সুচতুর কৌশলে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে পঙ্কিলতার চোরা স্রোত। রবীন্দ্রনাথের গানে রয়েছে 'মোর আমি ডুবে যাক নেমে',  কিন্তু শাসকের চক্রান্তে কৈশোর-যৌবনে ভুলেছে আমিত্বে। চরদিকে কেবল 'আমি'র জয়জয়কার।স্বভাবতই কিশোর-তরুণ-যৌবন ভুলেছে দেশ-কাল-স্বদেশের স্বপ্ন, ইতিহাস।এই দারুণ মূহুর্তে 'আধুনিকতার' প্যাকেজমোড়া ক্লীবত্বের চর্চা চালিয়েছে সারা দেশ।দেশ অর্থে শাসকের দেশ আর ক্ষুদিরাম,ভগৎ সিং মাস্টারদার জীবনসংগ্রামকে করে ফেলা হয়েছে লোপাট।বিদ্যাসাগর হয়েছেন 'ধান্দাবাজ, ফন্দিবাজ ব্যবসায়ী', রবীন্দ্রনাথকে বানানো হয়েছে 'পরশ্রীকাতর', ক্ষুদিরামকে 'সন্ত্রাসবাদী'। এঁদের স্মৃতিকে দেশ থেকে মুছে ফেলতে চায় শাসক। কারণ যৌবন বাঁচলে প্রতিবাদ বাঁচবে। প্রতিদিন প্রতিরাতে স্বদেশের লুঠকে মানবেনা সচেতন, মননশীল, সুচিন্তক যুব সম্প্রদায়। তাই ইতিহাসকে ক্রমাগত বিকৃতির উপায়ে বদলে ফেলা হচ্ছে।ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে সমাজ নামের সংজ্ঞা।কারণ রাজনীতি কেবল দলীয় প্রস্তাব, রাস্তার লড়াই আর ভোটবাক্সের বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকে।যে কোনো রাজনীতির সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিই গড়ে তোলে মনন।চিন্তার কাঠামো। যুক্তিপরম্পরা। এরদ্বারাই যুবসমাজ সিদ্ধান্ত নেয় পক্ষপাতী হওয়ার। শাসকের পক্ষ, শোষণের পক্ষ এর সঙ্গে আপোষ নতুবা দারুণ তেজে শিরদাঁড়া সোজা রেখে বিরুদ্ধতার জন্ম দেয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি-রাজনৈতিক চেতনা। 

এই চেতনাকে মেরে ফেলতে বারংবার আক্রমণ হানা হয় সংস্কৃতির জগৎ জুড়ে। সিনেমা একটি গুরত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী মাধ্যম এই জনমত গঠনের ক্ষেত্রে। সম্প্রতি যুবজীবনে অতি ট্রেন্ডিং মাধ্যম ওয়েব সিরিজ।অতিসম্প্রতি 'জি ফাইভ অরিজিন‌্যাল' নামক একটি ওয়েব প্ল্যাটফর্মে 'অভয়-২' নামে একটি ওয়েব সিরিজের সিনে দেখা গেল পুলিশ চৌকির ক্রিমিন্যাল লিস্টে আসামীর  ছবির জায়গার হরকিসিমের আসামীর ভিড়ে আটকে দেওয়া হয়েছে ক্ষুদিরামের ছবি।পরিচালক কেন(Ken), তিনি বাঙালী।জাতীয় জীবনের সঙ্গে সঙ্গতি মেনেই বাঙালী কেন-এর এই অকুতোভয় দূর্দমনীয়ের সাক্ষাত হয়তো হয়েছে  অনেক আগেই।সদ্য স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন শেষ করে আমরা পা বাড়িয়েছি ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসের দিকে।কিন্তু শাসকের বদল হলেও, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তুখোড় লড়াইয়ে আঁজলা আঁজলা রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে স্বাধীনতা আনল যারা স্বাধীন ভারতের বুকে 'অভয়-২' প্রোডিউসার, ডিরেক্টর এর সৌজন্যে ব্রিটিশের দেখানো পথেই তারা হয়ে রইলেন আসামী বা সন্ত্রাসবাদী।এ কোনো উদাসীনতা জনিত ভুলের বিষয় নয় বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির এবং শাসকের সংস্কৃতি।তারই রাজনৈতিক জমি প্রস্তুত, মনন গঠনে ঢালাও প্রচারের প্রসঙ্গ। এর সঙ্গে সুচতুর ভাবে বিপ্লববাদ ও সশস্ত্র ধারার বিপ্লবীদের অপমান ও অবমাননা করা হয়েছে। 


আবার একই সময়ে কেন্দ্রীয় শাসকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবী করছেন নয়া ইতিহাস রচনার।এমন দাবীও করেছেন ইতিহাসে ব্রিটিশদের সঠিক স্থান দিতে হবে।সাদা পাতার উপরে ছাপা কালো অক্ষর দিয়ে সাজানো যে ইতিহাস,ইমেজ ছাপ রাখে হরকিসিমের মনে, তাকেই উল্টেপাল্টে লিখতে হবে নয়া ইতিহাস।মুচলেকা দিয়ে প্রাণ ফিরে পাওয়া সাভারকরকে বীর বানাবার প্রয়াসের সর্বোতরকমের চেষ্টা অতুলনীয়।আবার একই সঙ্গে উক্ত দলের তরফেই বারেবারে হুংকার আসে রবীন্দ্র-নজরুল সংস্কৃতির তুমুল বিরুদ্ধতার। সিলেবাসে পড়ে রাষ্ট্রিক কোপ, বাদ পড়েন রবীন্দ্রনাথ।বাংলার ইতিহাস বদলে ফেলতে আমদানি করা হয় এক নব্য আরোপিত সংস্কৃতির। চিরপ্রচলিত বৈষ্ণব পদাবলীর সহজ সুর, মঙ্গলকাব্যের মানবিক আবেদন,লোকসঙ্গীতের সহজিয়া আবেদন এর বিপরীতে 'হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান'এর মন্ত্রপাঠ চলে অহরহ।সেসময়ে পর্দার সামনে এরকম উপস্থাপন একি ইতিহাস রচনারই নয়া কৌশল, নাকি অনিচ্ছাজনিত ভুল বিবেচনার দায় পাঠকের!

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কোন্ পথে অভয়ার বিচার? - অর্ক পুরোহিতের প্রতিবেদন

।।মহাপৃথিবীঃ মধ্যবিত্তের শয়নকক্ষে বার্লিন দেওয়াল ভেঙে পড়ার আখ্যান।। সায়ন্তন দত্ত

।।ঈশ্বর,লিবিডো ও অতিমারির একটি দিন।। ঊর্ণনাভ চট্টোপাধ্যায়