।।মুর্শিদাবাদে দুবার নন্দলাল বসু এসেছিলেন ছাত্র হীরাচাঁদের টানে।। গৌতম সরকার
"খেলা করা ও শিল্পসৃষ্টি করা এ দুয়েরই প্রবৃত্তির মূল একই। ... শিল্পসৃষ্টি কারো ফরমাস মতো হয় না। শিল্প রচনার সময় শিল্পী হয়ে পড়েন নির্ভয় , নিঃসংকোচ ; কারণ সে সময় তাঁর মনপ্রাণ আনন্দে তন্ময় হয়ে যায়।... সেই আনন্দ শিল্পীর হৃদয়ের সঙ্গে বর্হিলোকের যোগ স্থাপন করে , শিল্পীর হৃদয় ও বস্তুর মধ্যে একত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং এই ঐক্যবোধ থেকেই আনন্দের উৎপত্তি। পরে সেই আনন্দ শিল্পসৃষ্টি-রূপে প্রকাশিত হয় " - শিল্পসৃষ্টি সম্বন্ধে এরকম দার্শনিক তত্ত্ব এত সহজ ভাষায় শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু নিবদ্ধ করে গেছেন। শান্তিনিকেতনের কলাভবনের ইতিহাস যেসকল মানুষের স্বার্থত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল নন্দলাল বসু তাঁদের মধ্যে অন্যতম ।এই আনন্দ-আশ্রমের সমাজ শ্রদ্ধা করে ভালোবেসে আশ্রম-প্রধানদের নানারকম নামকরণ করেছিল।যেমন, রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ছিলেন ' গুরুদেব ', তেমনি নন্দলাল বসু ছিলেন 'মাস্টারমশাই'।আক্ষরিক অর্থে বিদ্যাদানেই শিক্ষকের কর্তব্য সমাপ্ত হয় না।শিক্ষকের সমগ্র জীবনাদর্শ একটি প্রদীপশিখার মতো জ্বলে উঠবে, আর ছাত্ররা তার থেকে নিজের জীবনের শিখা জ্বালিয়ে নেবে, এই আদর্শ নন্দলাল বসু কে অনুপ্রাণিত করেছিল।শান্তিনিকেতন তথা সমগ্র দেশের চিত্ত তাঁরই চিত্তের সাহচর্যে বিকশিত হয়েছে এটাই তাঁর ' মাস্টারমশাই ' নামের পরম সার্থকতা।
তবে পুরাকালের সেই গুরু ভক্তি যে একালেও সম্ভব সে কথা নন্দলাল ও তাঁর শিষ্যদের সম্পর্ক স্বচক্ষে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করত না।ছাত্রদের শুভাশুভ চিন্তায় তিনি ছিলেন তাঁদের অভিভাবক , সংকটে সমস্যায় সচিব , ললিত কলা চর্চায় প্রিয়সখা।ছাত্র-শিক্ষক মিলে কলাভবনে একটি অতি স্নিগ্ধ পারিবারিক জীবন গড়ে তুলেছিল।এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন - " তাঁর আত্মদান কেবলমাত্র শিক্ষকতায় নয় , সর্ব প্রকার বদান্যতায়।ছাত্রদের রোগে শোকে অভাবে তিনি ছিলেন তাদের অকৃত্রিম বন্ধু ।"
যদিও আপন শিক্ষা- প্রণালী সম্বন্ধে নন্দলাল বসু বলেছেন - " শেখাই নি ,একসঙ্গে কাজ করেছি।ছাত্রদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে কাজ করেছি।আমারটা দেখে ওরা শিখেছে ,ওদেরটা দেখে আমি।কে মাষ্টার,কে ছাত্র মনেই হয় নি "।এই হচ্ছে আদর্শ শিক্ষকের কথা। রবীন্দ্রনাথের ইংরেজ বন্ধু লেনার্ড এলমহার্স্টও বলেছিলেন - ' নন্দলালের সঙ্গ একটা এডুকেশান '।শান্তিনিকেতনে শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর সেই সাহচর্য যেসকল ছাত্র পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার হীরাচাঁদ দুগার।
জন্ম ১৮৯৮ সালে জিয়াগঞ্জের হাতিবাগান এলাকায়। স্থানীয় বিদ্যালয়ে পাঠ শেষ হবার আগেই পিতা সুরজমল তাঁকে ব্যবসায় নিয়ে আসেন।কিন্তু বাড়ির নিষেধ অগ্রাহ্য করে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৯১৫ সালে এসে ভর্তি হলেন কলকাতার সরকারি চারুকলা বিদ্যালয়ে।সেখানে তখন অধ্যক্ষ পার্সি ব্রাউন এবং শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন ঈশ্বরী প্রসাদ ও অসিত কুমার হালদার।এখানেই মোঘল রেখাঙ্কন, হাতির দাঁতের উপর মিনিয়েচার প্রতিকৃতি আঁকার পদ্ধতি ও ছবিতে সোনার তবক ব্যবহারের কলাকৌশল শিখেছিলেন ঈশ্বরীপ্রসাদ বর্মার কাছে।
এখানে অল্প কিছুদিন শিখে শিক্ষক অসিত কুমার হালদারের মাধ্যমে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন।এখানে প্রথম বছরে সহপাঠী হিসেবে পান অর্ধেন্দুপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণকিঙ্কর ঘোষ ও ধীরেন্দ্রকৃৃষ্ণ দেববর্মনকে।১৯২০ সালে শান্তিনিকেতনে কলাভবনের দায়িত্ব নেন নন্দলাল বসু।ওই সময়ের কথা বলতে গিয়ে হীরাচাঁদ বলেছেন - " শান্তিনিকেতনে আমরা স্যার হিসেবে নন্দলাল বসু ও সুরেন্দ্রনাথ করকে পেলুম
নন্দদার স্বভাবে মুগ্ধ হতে হল।অমায়িক ব্যবহার, অত বড় সাধক শিল্পী হয়েও লেশমাত্র অহংকার তাঁর মধ্যে নেই। আমরা বেশ মনের আনন্দে কাজ করে যেতুম।" ১৯২০ সালে ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর আঁকা পাঁচটি ছবি কলকাতায় ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টের বার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীতে উচ্চ প্রশংসিত হয় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পেন্সিলে ড্রইং করা "মাদার এ্যান্ড চাইল্ড "।১৯২১ সালে বিশ্ববিখ্যাত ' রূপম ' পত্রিকায় সেটি প্রকাশিত হয়।বলা হয়,অবনীন্দ্রনাথ-শৈলীর তিনি ছিলেন একজন যথার্থ উত্তরাধিকারী।ঐ বছরই তিনি স্ত্রী ও শিশুপুত্র ইন্দ্র দুগার কে নিয়ে আসেন শান্তিনিকেতনে।
কিন্তু পারিবারিক কারণে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে জিয়াগঞ্জের পৈতৃক গৃহে ফিরে আসেন।ওই সময় স্ত্রী বিয়োগ হওয়ায় দীর্ঘদিন শিল্পচর্চা থেকে বিযুক্ত ছিলেন।তবে শিল্পীবন্ধু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মণ,অর্ধেন্দুপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, রামেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী , বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায় , মণিভূষণ গুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত পত্রালাপ হত। শান্তি নিকেতন ছাড়ার পরই নন্দলাল এই ছাত্রের আকর্ষণে মোট দুবার মুর্শিদাবাদ এসেছিলেন।নন্দলাল বসু নিজেই বলেছেন -"... জিয়াগঞ্জ গেলুম হীরাচাঁদ দুগারের বাড়ি।জিয়াগঞ্জে দুগারদের বাস সেই জগৎশেঠের সময় থেকে।সেই সময়েই শেঠেরা ওদের আনিয়ে ছিল। এরাও বাঙ্কার। রাজপুতানার লোক।সেবারে সুরেন ,দিনুবাবু অনেকে সঙ্গে ছিলেন।হীরাচাঁদ আমাদের আমাদের থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থা করলেন। জিয়াগঞ্জে গেছি মোট দুবার।শেষ বারে আমাদের সঙ্গে ছিলেন দিনুবাবু।১৯২৪ সালে চীন জাপানে যাবার আগেই গেছি জিয়াগঞ্জের বাড়িতে "।
১৯২৬ সালে হীরাচাঁদ দুগারের মায়ের মৃত্যু এবং এই ঘটনার তিনমাস পর স্ত্রীর মৃত্যু শিল্পীকে একেবারে সাংসারিক বৃত্তের কেন্দ্রে এনে ফেলে।তিনি আটার কল চালাতে লাগলেন। পুত্র ইন্দ্র দুগারকে চিত্রাঙ্কনের কিছু করণ -কৌশল বোঝানো ছাড়া চিত্র-জগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে আসে।১৯৪২ সালে ইন্দ্র দুগার শান্তিনিকেতনে গেলে দীর্ঘ কুড়ি বছর পর পুনরায় শিল্পাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ হয় হীরাচাঁদ দুগারের।জলরঙের মাধ্যমে মিনিয়েচারধর্মী পাহাড়,উপত্যকা,হ্রদ ও নদীর দৃশ্যচিত্র রচনায় তিনি বিশেষ কৃৃৃতিত্ব অর্জন করেন। তাঁঁর অঙ্কিত চিত্রাদির মধ্যে 'ফতেসাগর লেক ' (উদয়পুর) , ' গৃৃধ্রকূট ' (রাজগীর), 'কাশ্মীরপন্ডিতানী ' , ' রাজগীর কুন্ড ' , ' গোধূলির আলোয় ' (কাথিয়াওয়়ার) , ' নাহারগড় ' ( জয়পুর) , ' কেশরীয়়াজির মন্দির ' , ' বাণগঙ্গা '( রাজগৃহ),' The blind musician ' অন্যতম।
১৯৪৬ সালে আবার ফিরে এলেন জিয়াগঞ্জে।এই ফেরা বাংলার চিত্রকলা জগতে এক অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।বিশেষজ্ঞরা বলেছেন ,এই সময়ের ছবির মেজাজই ছিল আলাদা,এ যেন এক আশ্চর্য নবজাগরণ।পরিণত বয়সে দৃশ্যপট আঁকার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। বিহারের রাজগৃহে একমাস কাল থেকে বহু স্কেচ ও ছবি আঁকেন ।১৯৫০ এর জানুয়ারি মাসে কলকাতার কুমার সিংহ হলে প্রথম তাঁর একক চিত্র প্রদর্শন হয়।স্বয়ং নন্দলাল বসু এই প্রদর্শনীর ছবি দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন।একবছর পর ১৯৫১ সালে তিনি শত্রুঞ্জয় জৈন তীর্থদর্শনে যান।সেখানে প্রতিদিন পূজাপাঠ শেষ করে পাহাড়ের মাথায় উঠে ছবি আঁকতেন।কিন্তু ১৯৫১ সালের ৩রা মে সৌরাষ্ট্রের পালিতানায় জৈনতীর্থ দর্শন করতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ঋণ:
(১) বিশ্বভারতী পত্রিকা: নন্দলাল বসু সংখ্যা ১৩৭৩ , সম্পাদনা- শ্রী সুশীল রায় ,
(২) ঝড় আলোকপাত--প্রথম সংখ্যা- জুন ২০১২ , (৩) সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান--প্রথম খন্ড,
(৪) মুর্শিদাবাদ মনীষা-প্রথম খন্ড, রমাপ্রসাদ ভাস্কর। কৃতজ্ঞতা: কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত
লেখক পরিচিতি: গৌতম সরকার, শিক্ষক কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুল ,



অসাধারণ।
উত্তরমুছুন