।।যে কাহিনীর একাধিক উপধারা আছে,পর্ব - এক।। শুভদীপ ভট্টাচার্য্য

যাওয়া মানে তো কেবলই যাওয়া নয়। পথের দেবতা প্রসন্ন জানিয়েছিল " মূর্খ বালক পথ তো আমার শেষ হয়নি... সে চলে.....।" মানুষের জন্মের পরপরই তার নিয়তি এই পথের পাঁচালী জুড়ে দিয়েছে তার ভাগ্যের সঙ্গে। সেই তাড়নাতেই তার কোথাও থামা নেই। জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে নিরন্তর তার প্রবহমানতা । এই চলাই একদিন অজান্তে সৃষ্টি করে ফেলে ইতিহাস। ছুঁড়ে দেয় কালের গহ্বরে। প্রজন্মান্তরে সেসবের সন্ধান করে কেউ কেউ। ডেস্কের টেবিলল্যাম্পের আলোর নীচে সন্ধানী দুটি চোখ অন্ধকারের উৎস থেকে নানা বিস্মৃত তথ্যকে সহযাত্রীর মতো হাত ধরে এনে ফেলে আলোর মধ্যে। নানা উপায়ে চলে আলোকপাত। একদিন টাইপের অক্ষর হয়ে ছাপা বইয়ের পাতা তেমন করেই সন্ধান দেয় বিস্মৃত কাশিমবাজার বন্দরের ইতিহাস। 

ভেনিস থেকে আসা সতেরো বছরের তরুন নিকালো মানুচী। নেহাতই কেরানি,এইটুকুই তার পরিচয়। ভারতে এসে পরিভ্রমন করতে করতে একসময় হাতে তুলে নেন কলম। ভূ-ভারতের দৈনিক যাপনের সে খণ্ডচিত্র চোখে পড়ে হরবখত। শেষ হয়েও শেষ হয়ে যায়না যে সবের রেশ।মানুচী  সেসবই লিখে রাখলেন অভিজ্ঞতানুযায়ী। স্টোরিয়া দে মোগল কালে কালে হয়ে ওঠে মানুচীর লেখা ইতিহাসের প্রামান্যগ্রন্থ। সেই গ্রন্থ গল্প শোনায় কাশিমবাজারের। ১৫৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর এর রাজত্বকালে বাংলার সিপাহসালার শাসক সৈয়দ খাঁ পত্তন করেন শহর সৈদাবাদ। সৈয়দ খাঁ এর নামানুসারে সৈদাবাদের প্রাচীন নাম সৈয়দাবাদ। ব্রাত্যজনের মত হলেও  কমজোরি একটি মত সওদা থেকে এসেছে সৈদাবাদ নাম। 


সৈদাবাদ থেকে অনতিদূরে সংলগ্ন এলাকা মাসুমাবাজার। বহুবিচিত্র ইতিহাসের গতিপথে চলতে গিয়ে একদিন নাম বদলে হয় কাশিমবাজার। মানুচির ইতিহাসকে ভিত্তি করে জানা যায় দিল্লির বাদশাহ হওয়ার আগে সম্রাট সাজাহান  তার বেগমকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন হুগলীর তীর ধরে পরিভ্রমনে। বুক হাট করে শুয়ে থাকা হুগলী সাদর আমন্ত্রন করলেও পর্তুগীজদের কাছে লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয় তাদের। নতমুখে ফিরে যান সাজাহান। দিল্লির মসনদ দখলের পর ভারতের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠেন সাজাহান। বুকে পুষে রাখা পুরাতন রাগ উশুল করতে সৈন্য সমাবেশ করেন পর্তুগীজ জব্দে। হুগলীর তীর লিখতে থাকে নয়া ইতিহাস। সন্ধিক্ষণ শেষ। ১৬৩২ সালে সাজাহানের বিশ্বস্ত সেনাপতি কাশিম খাঁ ধরাশায়ী করে ফেলে পর্তুগীজদের। চিরাচরিত ভঙ্গি মতো আবারও রাজবংশের পাপের ফলভোগ করতে হয় মেয়েদেরকেই। পরাজিত শত্রুশিবির থেকে কয়েকজন পর্তুগীজ মহিলাকে নিয়ে কাশিম খাঁ হাজির হন মাসুমাবাজারে। হুগলী বিজয়ী কাশিম খাঁ এসে আশ্রয় নেন সেখানেই। কাশিম খাঁ এর প্রতি শ্রদ্ধাবনত থাকতেই মাসুমাবাজার একদিন বদলে যায়, নামও বদলে যায় তার, নয়া নাম হয় কাশিমবাজার। এভাবেই কালের ফেরে সে এখন একটি মামুলি জনবসতিপূর্ণ এলাকা কেবল। 

লেখা ঋণ- কৌশিক চ্যাটার্জি । 

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কোন্ পথে অভয়ার বিচার? - অর্ক পুরোহিতের প্রতিবেদন

।।মহাপৃথিবীঃ মধ্যবিত্তের শয়নকক্ষে বার্লিন দেওয়াল ভেঙে পড়ার আখ্যান।। সায়ন্তন দত্ত

।।ঈশ্বর,লিবিডো ও অতিমারির একটি দিন।। ঊর্ণনাভ চট্টোপাধ্যায়