।।জনতা কারফিউয়ের ডায়রি।। শিমূল সেন



ছবিতে আর কতটুকু বোঝা যায়। সাউন্ডস্কেপ হাজির করা গেলে হয়তো ভাল হত। জনতা কারফিউয়ের সকালকার কলকাতার যে রূপ দেখলাম, কোনও দিনই তা দেখি নি। আমার বাবারা কোল্ড ওয়ার, নকশালবাড়ি প্রজন্ম– মানুষী সভ্যতার একেবারে তুঙ্গ ক্লাইম্যাক্স। মৃদু হেসে বলা যায়, ওঁরাও ওঁদের যৌবনে দেখেন নি।

হাওয়া যে হাওয়া, তাকেও চেনা যাচ্ছে এই রোববার সকালে। রোদ্দুর যে রোদ্দুর, সেও আলাদা করে স্পর্শযোগ্য। চার-পাঁচটি বাড়ি পরে প্রেশার কুকারে সিটি পড়ল, পাখি অনেক ওপরে ডানা ঝাপটাল, চার পাশ খাঁ খাঁ চুপচাপ– শুধু অবিশ্রাম রোদ্দুর আর হাওয়ার খেলা। গাছে জল দিচ্ছি, বহু দিন পর সে পরম মমতায় আস্বাদ নিচ্ছে অমোঘ সঞ্জীবনীর, সবুজ পাতায় জলের স্পর্শশব্দ নৃত্যমুদ্রা-সমেত যেন খেল দেখাচ্ছে। একটি যানের মৃদু ঘড়ঘড় শোনা গেল: মাথার ওপরের উড়োজাহাজ। তা বাদে পাখির ডাক, আর নীচে বিরামহীন ধুধু কলকাতা।

পাখিদের আজ তুমুল আনন্দ। সকাল থেকে ধোঁয়া-ধুলোর গর্জন নেই, নীল আকাশে তিড়িংবিড়িং নাচছে। মোদ্দায়, কলকাতার এই দৃশ্যকল্প, এই চেহারা– পিন পড়লেও আজ আওয়াজ পাওয়া যাবে এই শহরে৷ করোনার উদ্বেগে চতুর্পাশ থইথই, তার মধ্যে না হয় এই হু-হু ধু-ধু অলস মধ্যবিত্ত বেলা-কাটানোর দিনে এটুকু দূরসঞ্জাত রোম্যান্টিকতার পরত রইল৷ আজ ভাবছি ঠাকুমাকে কী বলতাম এই সকালে। হয়তো, তোমরা বিশ্বযুদ্ধ ব্ল্যাক আউট দুর্ভিক্ষের কাতরানি দেখেছ– জাপানি বোমার ভয়ে বাবুরা যখন শহরপারের সাতপুরুষের ভিটেয় পালাত। তোমরা হয়তো দেখেছ এই ধুধু সকাল, অথবা নিঃশব্দ ওয়েলিংটনে শুধু ট্রামের ধাতব লৌহমর্মর পূর্ণিমার স্তব্ধ চাঁদ বেয়ে গলে গলে পড়ছে। কিন্তু আমরা ২০২০ দেখলাম। খুব বার্ডস আইতে দেখলে কী দেখাত ধর্মতলা? পার্ক স্ট্রিট? রাসবিহারী? শ্যামবাজার? শহরের বড় প্রাণকেন্দ্রগুলি?

সকালে উঠে কোভিটআউট ইন্ডিয়া দেখেছিলাম। ডিকেন্সের উপন্যাসে বুড়ি উল বুনতে বুনতে লাশ গুনত। ইতালি খাঁ খাঁ, সাঁজোয়া গাড়িতে করে শহরের বাইরে লাশ ফেলে দিচ্ছে। পরিবার-পরিজন নেই, কবরের সমস্ত সিট অলরেডি দখল, অতএব শহরের পাশে উপনিবেশ গড়েছে মৃত্যুখানা। ভার্চুয়ালে, আমাদের তো উলবুননের শৌখিন আলস্যপ্রসূত অবসর-কণ্ডূয়ন নেই– ভীষণ তথ্যময়, স্মার্ট ওয়ার্ল্ডোমিটার আর কোভিটআউট ওয়েবসাইট রয়েছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়। সকালে দেখলাম, ভারতে ৩৩২। আচ্ছা, সংক্রমণের হার কালকের চেয়ে কি একটু কম?

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কোন্ পথে অভয়ার বিচার? - অর্ক পুরোহিতের প্রতিবেদন

।।মহাপৃথিবীঃ মধ্যবিত্তের শয়নকক্ষে বার্লিন দেওয়াল ভেঙে পড়ার আখ্যান।। সায়ন্তন দত্ত

।।ঈশ্বর,লিবিডো ও অতিমারির একটি দিন।। ঊর্ণনাভ চট্টোপাধ্যায়