।।একটি না ফিরতে চাওয়ার আখ্যান।। সায়ন্তন বিশ্বাস
প্রথমে ঠিক ছিল অক্টোবর সিজন শেষে সপ্তাহান্তের ভ্রমণে ঢু মেরে আসবো পশ্চিম ও দক্ষিণ সিকিম এবং ভ্রমণপঞ্জিতে গতানুগতিকতা কম থাকবে।কিন্তু বাদ সাধল পরীক্ষার হঠাৎ প্রি-স্যিডুলিং। অগত্যা পোস্ট - সিজন প্ল্যান টেনে আনলাম প্রি সিজনে। অত কম নোটিশে ট্রেনের টিকিট পাওয়া ভগবান দর্শনের মতো ব্যাপার, তবে সৌভাগ্যবশত ব্রেক জার্নি করে যাওয়ার কনফার্ম টিকিট পেয়ে গেলাম।অগত্যা খাগড়াঘাট রোড স্টেশন থেকে রাধিকাপুর এক্সপ্রেসে চেপে পড়লাম ২৭ তারিখ রাতে।মালদায় পৌঁছে রিটায়ারিং রুমে ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষার পর ট্রেন বদল করে নির্ধারিত পদাতিক এক্সপ্রেসে উঠে বসি।
পরের দিন এনজেপি স্বাগত জানালো ঝিরঝিরে বৃষ্টি সাথে নিয়ে,মনটা একটু খারাপ হলেও তখনও বুঝিনি বৃষ্টি বাবাজির অকাল কৃপায় পুরো প্ল্যানকে মডিফাই করতে হবে। যাইহোক, শিলিগুড়ির কুখ্যাত যানজট পেরিয়ে যখন জংশন পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে ১০:৩০! গন্তব্য রিনচেনপং, শেয়ার গাড়িতে যেতে হলে দুটো রুটে যাওয়া যায়, একটা জোড়থাং হয়ে, আরেকটা মেল্লি হয়ে। এসব জানা ছিল, তবে যেটা অনেকেই বলতে ভুলে যায়, তা হল শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং-গ্যাংটক বাদে বাকি জায়গার শেয়ার গাড়ি পেতে হলে সকাল আটটার আগে শিলিগুড়ি আসতে হয়। আরও আধঘন্টা জোড়থাং শেয়ার খুঁজে না পেয়ে ইতিউতি করার পর বেহালার লোক অমিত বাবুর স্করপিওতে ডাইরেক্ট রিনচেনপং যেতে রাজি হই । জোড়থাং এর কিছু আগে ৫০০ মিটার মত স্ট্রেচ বৃষ্টিতে খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল, তবে গোটা রাস্তা অমিতবাবুর ভীষণ সাবধানী ড্রাইভিং এবং গল্পে আড্ডায় প্রায় ১৪০ কিমি পথ অতিক্রম করে হোটেল রিনচেনপং নেস্টে এসে পৌঁছলাম বিকেল সাড়ে চারটায়। সারাদিন মেঘ আর বৃষ্টিতে কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউয়ের দফারফা হলেও বৃষ্টিভেজা পাহাড়, ঘন সবুজ জঙ্গল আর সাথে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক ঝর্না রোডট্রিপ টাকে এক মায়াবী রূপ দেয়।
ফ্রেশ হয়ে নিয়েই পশ্চিম সিকিমের এই ছোট্ট জনপদ আবিষ্কারে বেরোই। গুটিকয়েক হোটেল, একটা ছোটো মার্কেট, মার্কেট লাগোয়া ট্যাক্সি স্ট্যান্ড আর দুটো মনাস্ট্রি, মোটের ওপর এই হল রিনচেনপং। সন্ধ্যা ছয়টায় মনাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যায়, তাই একটু হাটাহাটি এর পর রাত আটটায় ফিরে আসি হোটেলে। রিনচেনপং নেস্ট হোটেলটি আসলে একটি হোম স্টে, ওদের অসাধারণ আতিথেয়তা আর ঘরে বানানো সুস্বাদু পাহাড়ি খাবার মেঘের বিষন্নতায় প্রলেপ লাগায় কিছুটা। পরদিন অর্থাৎ ২৯ তারিখ ভোর পাঁচটায় উঠে পড়ে পায়ে হেঁটে রওনা দিলাম রিনচেনপং মনাস্ট্রির উদ্দেশ্যে। মনাস্ট্রির রাস্তা উঠে গেছে রিনচেনপং মার্কেট এর পুলিশ বুথ এর পেছন দিয়ে, পায়ে হেঁটে খাড়াই ঘন জঙ্গল ঘেরা পথে আড়াই কিলোমিটার মত পথ, পথে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হিসেবে থাকে কুকুর।
একটানা বৃষ্টি তখনও হয়েই চলেছে, একেবারে সুনসান রাস্তা, গা ছমছমে পরিবেশে গুগল ম্যাপে দেখানো পথে এগিয়ে মনাস্ট্রি খুঁজে পাই। সূর্যোদয় দেখার আশা বৃথা, অতএব ছবিপর্ব শেষ করে এবার খোঁজ পয়েশন লেকের। এটার রাস্তা গুগল বাবার হিসেবের বাইরে কারণ এটা কোনো রাস্তা নয়, জঙ্গল এর মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁটে তৈরি পথ মাত্র, মনাস্ট্রি যাবার রাস্তা থেকে বামদিকে ঢুকে নিচের দিকে নেমে যায়। এসব দেখে ফেরার পথে হোটেলের একদম কাছেই রিশুম মনাস্ট্রি দর্শন করে দশটার মধ্যে রেডী হয়ে যাত্রা শুরু রাবং-লা এর উদ্দেশ্যে। লেগশিপ বাজার থেকে রাবং-লা'র রাস্তা খুব ভালো হলেও রেশি থেকে রাস্তা বেশ সংকীর্ণ ও ধস-প্রবণ। যাইহোক,রাবং-লা পৌঁছে দেখা গেল বৃষ্টির প্রবলতা অনেকটা বেশি।সেখানে বুদ্ধ পার্কের বুদ্ধ স্বয়ং ঢাকা পড়েছেন মেঘের আড়ালে। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে পূর্ব পরিকল্পনা মতোই রওনা দিলাম রালং বোরং সাইটসিইং এর উদ্দেশ্যে।
টেমি টি গার্ডেন, সামড্রুপটসে দেখে নামচি শহরে পৌঁছে দেখি ঝলমলে রোদ। চার ধাম দেখে ফেরার পথে ভাবলাম বুঝি বুদ্ধের পেছনে এবার হয়ত উঁকি দেবে ঘুমন্ত বুদ্ধ, কিন্তু আবার রাবং-লা স্বাগত জানাল ঘন মেঘ দিয়ে। মার্কেট ঘুরে ডিনার করে ফিরলাম হোটেল, পরদিন ফেরার সেয়ার গাড়ির সিট বুক করে। আকাশের মত আমাদেরও মন ভার।না দেখা আর না পাওয়ার আক্ষেপ ততক্ষণে কাবু করে ফেলেছে অনেকটা।বোধহয় ফিরতে হবে বলেই।যাইহোক নিতান্ত মনখারাপের মধ্যেই ঘুমে ডুব দিলাম।
পরদিন অভ্যাসবশত ভোরে উঠে জানলার পর্দা সরিয়ে নজরে এলো সেই অপূর্ব দৃশ্য - সোনালী বুদ্ধের পেছনে মেঘের ফাঁকে উকি দিচ্ছে তুষারাবৃত হিমালয়, ঝটপট ডেকে তুললাম সঙ্গীকে।বরাবর পাহাড়কে ভালোবেসেছি।এমন প্রেমিক হয়তো অনেকেই।তবু বিস্মিত এবং পরম আনন্দিত হতে ভালো লাগলো এই ভেবে যে আমাকে হিমালয় অন্তত খালি হাতে ফেরালো না।এর পরেরটুকু পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিরে আসা - সাড়ে সাতটার গাড়িতে দুপুর দুটোয় শিলিগুড়ি, তারপর সেখান থেকে সন্ধ্যা সাতটায় পৌলমী পরিবহনের ভলভো বি ১১ আর সেমি-স্লিপার বাসে চেপে সোজা কোলকাতা!
প্রত্যেক বছরের মতো এটাই হয়তো আমাদের সিকিম ভ্রমণের একমাত্র সুযোগ।আবার হয়তো পরের বছর ফিরে আসবো সৌন্দর্য আর আতিথেয়তার টানে এক বিষণ্ণ ভালোলাগায়।যে ভালোলাগার কোন ইতি নেই।তার প্রতিটি মুহূর্ত যেন অনশ্বর,যারা আত্মীয়বিচ্ছেদের বেদনা সত্ত্বেও কখনো একটি ভবঘুরেকেও প্রসন্ন হাসির মতো বিদায় জানাতে কার্পণ্য করেনি।






মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন